স্বাস্থ্য

মারাত্বক ৩টি চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা

আমাদের মধ্যে যারা স্বাস্থ্যসচেতন চিয়া সিড তাদের খাদ্যতালিকায় খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ওজন কমানো, হজমশক্তি বাড়ানো, শক্তি বৃদ্ধি এসব কারণে অনেকেই প্রতিদিনের খাবারে চিয়া সিড ব্যবহার করেন। কিন্তু যতই উপকারী হোক, যেকোনো খাবারেরই কিছু না কিছু ঝুঁকি থাকে। তাই চিয়া সিড খাওয়া শুরুর আগে চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। 

কারণ ভুলভাবে বা অতিরিক্ত খেলে এই ছোট বীজটিই পেটের অস্বস্তি, গ্যাস, ডায়রিয়া এমনকি শ্বাসরোধের মতো সমস্যাও তৈরি করতে পারে। অনেকের শরীরের সঙ্গে মানিয়ে না নেওয়ার কারণে অ্যালার্জি পর্যন্ত হতে দেখা যায় মাঝে মধ্যে। তাই উপকারের পাশাপাশি সম্ভাব্য অপকারিতা, ঝুঁকি এবং কারা সাবধান থাকবেন? এসবও জানতে হবে আমাদের।

বুঝেই গেছেন, ইনফো ভান্ডারের আজকের লেখায় কী থাকছে আসলে।  আমাদের আজকের এই লেখায় চিয়া সিড কী? চিয়া সিড এর পুষ্টিগুণ থেকে শুরু করে চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। তাহলে শুরু করা যাক?

চিয়া সিড কী ? চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা

চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা

চিয়া সিড মূলত এক ধরনের পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ বীজ, যা ফাইবার, ওমেগা-৩, প্রোটিন ও খনিজ উপাদানে ভরপুর। এর উচ্চ ফাইবার উপাদান হজমে সাহায্য করলেও, অনেক সময় এই অতিরিক্ত ফাইবারই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চিয়া সিড পানির সংস্পর্শে এলে দ্রুত ফুলে জেলির মতো হয়ে যায়, আর এই বৈশিষ্ট্যই কখনও কখনও চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা তৈরি করতে পারে। 

বিশেষ করে না জেনে চিয়া সিড শুকনো অবস্থায় খেলে এটি গলা বা খাদ্যনালিতে ফুলে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা আপনার মারাত্মক সমস্যার কারণ হতে পারে। আবার যাদের হজমের সমস্যা, গ্যাস, অম্বল বা আইবিএস-এর মতো রোগ আছে, তাদের ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার ফাইবার পেটফাঁপা, গ্যাস ও ব্যথা বাড়িয়ে দিতে পারে। চিয়া সিড রক্ত পাতলা করার ক্ষমতাও রাখে, যা ব্লাড থিনার ওষুধ খাওয়া ব্যক্তিদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই চিয়া সিড যতটা উপকারী, ভুল ভাবে খেলে ততটাই ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়।

চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা

চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা

১. পেট ফাঁপা, গ্যাস ও অস্বস্তি

চিয়া সিডে ফাইবারের পরিমাণ খুব বেশি, যা হজমে সাহায্য করলেও অনেক সময় অতিরিক্ত ফাইবারই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যারা হজমের সমস্যা, অম্বল, গ্যাস বা আইবিএস-এ ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে বেশি চিয়া সিড পেট ফাঁপা, বমিভাব, গ্যাস জমা এবং ক্র্যাম্প বাড়াতে পারে। এটি চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা এর সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর একটি। হঠাৎ করেই বেশি পরিমাণে চিয়া সিড খেলে পেটের ভেতরে চাপ তৈরি হয়, ফলে খাবার হজম ধীর হয়ে যায় এবং অস্বস্তি বাড়ে।

আরও পড়ুনঃ সেরা ৫ টি কলার উপকারিতা ও অপকারিতা জেনে নিন (2025)

২.গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি

চিয়া সিডের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এটি পানির সংস্পর্শে এসে দ্রুত ফুলে ওঠে। শুকনো অবস্থায় খেলে এই বীজগুলো খাদ্যনালিতে বা গলায় আটকে গিয়ে সেখানেই ফুলে যেতে পারে, যা শ্বাসকষ্টের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাই যাদের গিলতে সমস্যা, এসিড রিফ্লাক্স বা খাদ্যনালি সংকীর্ণতার সমস্যা আছে, তাদের জন্য শুকনো চিয়া সিড খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। এই কারণে অনেক ডাক্তার সরাসরি শুকনো চিয়া সিড না খাওয়ার পরামর্শই দেন। এটি চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা এর অন্যতম প্রধান মারাত্বক দিক।

৩. রক্ত পাতলা করার ঝুঁকি

চিয়া সিডের ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রক্তকে স্বাভাবিকভাবে পাতলা করার প্রবণতা রাখে। যারা ব্লাড থিনার, যেমন ওয়ারফারিন বা এসপিরিন জাতীয় ওষুধ খান, তাদের জন্য চিয়া সিড রক্তক্ষরণ বা ব্রুইজিং বাড়াতে পারে। অস্ত্রোপচারের আগে বা পরে চিয়া সিড খাওয়া আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই যাদের রক্ত সংক্রান্ত সমস্যা আছে বা পাতলা রক্তের ওষুধ সেবন করেন, তাদের ক্ষেত্রে চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

যারা চিয়া সিড খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন

যদিও চিয়া সিড উপকারি, কিছু বিশেষ ব্যক্তির জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। যাদের হজমের সমস্যা, অম্বল, গ্যাস বা আইবিএস রয়েছে, তাদের জন্য উচ্চমাত্রার ফাইবার পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে। আবার যারা ব্লাড থিনার ওষুধ খাচ্ছেন, তাদের জন্য চিয়া সিডের রক্ত পাতলা করার প্রবণতা বিপজ্জনক হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ পলিসিস্টিক ওভারি থেকে মুক্তির পদ্ধতি । কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার জানুন

আবার ছোট শিশুদের চিয়া সিড খাওয়ানো উচিত নয়, কারণ তারা সহজেই শুকনো বীজ গলায় আটকে ফেলার ঝুঁকিতে থাকে। গর্ভবতী মা ও স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রেও চিয়া সিড কিছু ক্ষেত্রে গ্যাস বা পেটফাঁপার সমস্যা বাড়াতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ক্রমেই অতিরিক্ত খাওয়া ঠিক নয়। এছাড়া যাদের বাদাম বা বীজজাত খাদ্যে অ্যালার্জির ইতিহাস আছে, তারা চিয়া সিড খেলে অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া পেতে পারেন। তাই উপকারের পাশাপাশি চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা মাথায় রেখে সাবধানে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

ভুলভাবে চিয়া সিড খেলে কী হতে পারে?

চিয়া সিড যতই উপকারী হোক, ভুলভাবে খেলে কিন্তু এর ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়। চিয়া সিড খাওয়ার সবচেয়ে সাধারণ ভুল হলো শুকনো চিয়া সিড খাওয়া। শুকনো অবস্থায় এটি পানির সংস্পর্শে এসে দ্রুত ফুলে গিয়ে গলা বা খাদ্যনালিতে আটকে যেতে পারে, যা ভয়াবহ বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে। অনেকেই হঠাৎ করে বেশি পরিমাণে চিয়া সিড খাওয়া শুরু করেন, আর এতে অতিরিক্ত ফাইবার শরীরে প্রবেশ করে পেট ফাঁপা, গ্যাস, ডায়রিয়া এবং পেটব্যথার মতো সমস্যা সৃষ্টি করে।

তাছাড়া খালি পেটে অতিরিক্ত চিয়া সিড খাওয়া হজম ব্যবস্থা বিঘ্নিত করতে পারে। যাদের অম্বল বা এসিড রিফ্লাক্স আছে, তাদের ক্ষেত্রে চিয়া সিড ফুলে যাওয়ার কারণে চাপ বাড়ে এবং অস্বস্তি আরো তীব্র হয়। তাই ভুলভাবে ব্যবহার করলে চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা অনেকগুণ বেড়ে যায় এবং উপকারের বদলে ক্ষতিই বেশি হয়।

আরও পড়ুনঃ লবঙ্গ উপকারিতা ও অপকারিতা। লবঙ্গ খাওয়ার নিয়ম কী?

চিয়া সিড খাওয়ার সঠিক নিয়ম

চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা

চিয়া সিড সঠিক নিয়মে খেলে এটি যেমন উপকার দেয়, তেমনি সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকেও আপনাকে দূরে রাখে। সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো চিয়া সিডকে অন্তত ৩০ মিনিট পানি বা দুধে ভিজিয়ে তারপর খাওয়া, যাতে এটি আগে থেকেই নরম হয়ে পেটে সমস্যা না সৃষ্টি করে। কেউ চাইলে সারা রাত ভিজিয়ে রেখে সকালে পান করলেও উপকার পাওয়া যায়।

সাধারণত প্রতিদিন ১ থেকে ১.৫ টেবিল চামচ (প্রায় ১৫–২০ গ্রাম) চিয়া সিডকেই নিরাপদ ধরা হয়। এর বেশি খেলে অতিরিক্ত ফাইবার শরীর অস্বস্তিকর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। খাওয়ার সময় পর্যাপ্ত পানি পান করাও কিন্তু খুবই জরুরি, কারণ চিয়া সিড পানি শোষণ করে অনেকটাই ফুলে ওঠে। ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ বেশি পরিমাণে না খেয়ে প্রতিদিন অল্প করে শুরু করতে হবে আপনার। যাদের গ্যাস্ট্রিক বা হজমের সমস্যা আছে, তারা আরও সতর্ক থাকবেন। সঠিক নিয়ম মেনে চললে চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা কমে যায় এবং এটি নিরাপদভাবে আপনার খাদ্যতালিকায় রাখতে পারবেন অনায়াসেই।

আরও পড়ুনঃ তরমুজের উপকারিতা ও অপকারিতা জেনে নিন (2025)

উপসংহার

চিয়া সিড একটি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার হলেও সঠিক নিয়ম না মানলে এটি উপকারের চেয়ে ক্ষতির কারণ হতে পারে বেশি। অতিরিক্ত ফাইবার, শুকনো অবস্থায় ফুলে যাওয়ার প্রবণতা, রক্ত পাতলা করার ঝুঁকি এসব কারণে চিয়া সিড সবাইকে একইভাবে মানায় না। তাই নিজের শারীরিক অবস্থা, পূর্বের রোগ ইতিহাস এবং দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে যারা ব্লাড থিনার ওষুধ খান, অম্বল বা আইবিএস সমস্যায় ভোগেন, তাদের আরও সতর্ক থাকা উচিত। সচেতনভাবে ব্যবহার করলে চিয়া সিড উপকার দিতে পারে, কিন্তু অসাবধান হলে সমস্যা বাড়তে পারে। তাই চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা সম্পর্কে জানা এবং সীমিত পরিমাণে খাওয়াই স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।

পরিশেষে, ইনফো ভান্ডারের আজকের আর্টিকেলে আমরা চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা সম্পর্কিত যাবতীয় প্রায় সকল কিছুই জানলাম। আশা করি প্রিয় পাঠক “চিয়া সিড খাওয়ার অপকারিতা” এ প্রশ্ন নিয়ে প্রায় সকল তথ্যই ভালোভাবেই জানতে পেয়েছেন আমাদের আজকের এই লেখা থেকে!

সবশেষে, আশা করি আমাদের আজকের আর্টিকেলটি আপনার ভাল লেগেছে। কিছুটা হলেও উপকার হয়েছে পাঠকের। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে অনুরোধ থাকবে এই ব্লগ পোস্টটি প্রিয় জনদের সাথে শেয়ার করুন। আর কমেন্ট সেকশনে নিজের মূল্যবান মন্তব্য রেখে যেতে ভুলবেন না কিন্তু! আজকের মতো এখানেই শেষ করছি, দেখা হচ্ছে পরবর্তী কোনো এক লেখায়!

M.A. Habib

আমি এ.এইচ. তূর্য, অজানাকে জানতে ও জানাতে ভালোবাসি। লেখা-লেখির প্রতি আগ্রহ ছিল অনেক আগ থেকেই। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে "ইনফো ভান্ডার" সহ নিজস্ব কিছু সাইটে নিয়মিত লেখালেখির চর্চা করা হয়। পাঠককে সঠিক তথ্য দিয়ে উপকৃত করাই আমার এই শ্রমের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button